অক্সফামের পূর্বাভাসে পরিবর্তন

এক দশকের মধ্যে পাঁচ ট্রিলিয়নেয়ার পাবে বিশ্ব

বিশ্বের ধনকুবেরদের সম্পদ সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অতি দ্রুত হারে বাড়ছে, একই সঙ্গে ধনী-গরিবের বৈষম্য প্রকট হয়ে উঠছে।

বিশ্বের ধনকুবেরদের সম্পদ সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অতি দ্রুত হারে বাড়ছে, একই সঙ্গে ধনী-গরিবের বৈষম্য প্রকট হয়ে উঠছে। এমন পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ব প্রথমবার পেতে যাচ্ছে ১ ট্রিলিয়ন বা ১ লাখ কোটি ডলার সম্পদধারী ব্যক্তি। গত বছর এক পূর্বাভাসে দাতব্য সংস্থা অক্সফাম জানিয়েছিল, এক দশকের মধ্যে বিশ্ব একজন ট্রিলিয়নেয়ার পেতে যাচ্ছে। কিন্তু এবার সে পূর্বাভাসে সংশোধন এনে বলছে, পাঁচজনের মতো ট্রিলিয়নেয়ার আবির্ভূত হবেন আগামী বছরগুলোয়। খবর দ্য গার্ডিয়ান।

অক্সফামের ‘টেকার্স নট মেকার্স’ শিরোনামের প্রতিবেদনটি এমন সময় প্রকাশ হয়েছে, যখন বৈশ্বিক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, করপোরেট নির্বাহী ও অতিধনীরা সুইস স্কি রিসোর্ট ডাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) বার্ষিক সভায় যোগ দিতে যাচ্ছেন।

প্রথমবার ট্রিলিয়নেয়ারের আবির্ভাব সম্পর্কে অক্সফামের বৈষম্য নীতিবিষয়ক প্রধান অ্যানা ম্যারিয়ট বলেছেন, ‘গত বছর আমরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলাম যে প্রথম ট্রিলিয়নেয়ার এক দশকের মধ্যে আবির্ভূত হতে পারে। কিন্তু সম্পদ বৃদ্ধির বিস্ময়কর গতি এখন দেখাচ্ছে যে অন্তত পাঁচজন ট্রিলিয়নেয়ার হতে চলেছে।’

প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৪ সালে বৈশ্বিক ধনীদের সম্পদ বেড়েছে ২ ট্রিলিয়ন বা ২ লাখ কোটি ডলার, এ সময় প্রতিদিন গড়ে তাদের সম্পদ বেড়েছে ৫৭০ কোটি ডলার, যা ২০২৩ সালের তুলনায় তিন গুণ বেশি।

আরো একটি উল্লেখযোগ্য সময়ে অক্সফাম প্রতিবেদনটি আনল, যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিচ্ছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ধনীদের জন্য বড় আকারের করছাড় দেয়ার পরিকল্পনা করছেন। নিজের পরামর্শক দলে বেশ কয়েকজন বিলিয়নেয়ার অন্তর্ভুক্ত করার ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প। এদের মধ্যে রয়েছে ৪০ হাজার কোটি ডলারের বেশি সম্পদ অর্জনের মাইলফলক অর্জনকারী প্রথম ব্যক্তি ইলোন মাস্ক।

বিশ্বব্যাংকের হিসেবে, দৈনিক ৬ ডলার ৮৫ সেন্ট আয় করেন এমন ব্যক্তিরা দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করেন। ১৯৯০ সালের পর থেকে এদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তন হয়নি, যা বর্তমানে ৩৬০ কোটির কাছাকাছি অর্থাৎ বিশ্ব জনসংখ্যার প্রায় ৪৪ শতাংশ। ১০ জন নারীর মধ্যে একজন চরম দারিদ্র্যে বাস করেন, যাদের দৈনিক আয় ২ ডলার ১৫ সেন্ট। এতে পুরুষের তুলনায় চরম দারিদ্র্যে রয়েছেন এমন নারীর সংখ্যা ২ কোটি ৪৩ লাখের বেশি। অক্সফাম সতর্ক করেছে, দারিদ্র্য দূরীকরণে অগ্রগতি বন্ধ হয়ে গেছে। শুধু বৈষম্য কমানো গেলে চরম দারিদ্র্য তিন গুণ দ্রুত দূর করা সম্ভব।

জি৭ দেশের মধ্যে যুক্তরাজ্যে ধনকুবেরদের সম্পদের অনুপাত সবচেয়ে বেশি। সেখানে ২০২৪ সালে প্রতিদিন তাদের সম্পদ ৩ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ড বেড়ে ১৮ হাজার ২০০ কোটি পাউন্ডে পৌঁছেছে। গত বছর যুক্তরাজ্যে চার নতুন বিলিয়নেয়ার যুক্ত হয়েছেন, ফলে মোট বিলিয়নেয়ারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৭।

২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে, যা ধনকুবেরদের সম্পদ বাড়ার মূল কারণ। পাশাপাশি আবাসিক সম্পদের মূল্যবৃদ্ধিও ভূমিকা রেখেছে। বৈশ্বিক বিনিয়োগের প্রায় ৮০ শতাংশই আবাসিক সম্পদ।

গত বছর বিশ্বজুড়ে ধনকুবের বেড়েছে ২০৪ জন। সব মিলিয়ে বিলিয়নেয়ারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৭৬৯-তে। তাদের সম্মিলিত সম্পদ ১৩-১৫ লাখ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে, যা বৈশ্বিক ধনীদের সম্পদের তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্তি শুরুর পর থেকে দ্বিতীয় বৃহত্তম বার্ষিক বৃদ্ধি।

বিশ্বের ১০ জন ধনী পুরুষের সম্পদ গড়ে দৈনিক ১০ কোটি ডলার বেড়েছে। তাদের সম্পদ এতটাই বেড়েছে যে ৯৯ শতাংশ সম্পদ রাতারাতি হারালেও বিলিয়নেয়ার হিসেবে মর্যাদা ধরে রাখবেন।

এদের মধ্যে রয়েছেন অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস, যার সম্পদ ২১ হাজার ৯৪০ কোটি ডলার। জার্মানি, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও স্পেনের অনলাইন বিক্রির ৭০ শতাংশ বা তার বেশি দখল করে আছে অ্যামাজন। আফ্রিকার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি আলিকো ডাঙ্গোটের সম্পদের পরিমাণ ১ হাজার ১০০ কোটি ডলার। নাইজেরিয়ায় সিমেন্টের বাজারে তিনি প্রায় একক আধিপত্য বিস্তার করেছেন।

প্রতিবেদনটি দাবি করেছে, অতিধনীদের অধিকাংশ সম্পদ উপার্জিত নয়, বরং বিভিন্নভাবে হস্তান্তরের ফল। এর ৬০ শতাংশ উত্তরাধিকার, ‘দুর্নীতি ও পক্ষপাত’ বা একচেটিয়াভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ থেকে এসেছে। একচেটিয়া বলতে প্রতিযোগিতার অভাব, মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা, বিকল্পের অভাব ও বাজারে আধিপত্য বোঝায়। এ ধরনের ক্ষমতার মাধ্যমে এসেছে ১৮ শতাংশ সম্পদ।

ইলোন মাস্ক ও জেফ বেজোসের পর ফোর্বসের রিয়াল টাইম বিলিয়নেয়ার তালিকায় বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিরা হলেন ফেসবুক ও মেটার সহপ্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গ, ওরাকলের সহপ্রতিষ্ঠাতা ল্যারি এলিসন ও এলভিএমএইচের প্রতিষ্ঠাতা বেহেনা আহনোঁ। সম্পদ অর্জনের ক্ষেত্রে প্রযুক্তি খাত এখন এগিয়ে রয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে মাস্ক, বেজোস ও জাকারবার্গের কাছাকাছি অবস্থান রাজনীতিতে প্রযুক্তি কোম্পানির ক্রমবর্ধমান প্রভাবের ইঙ্গিত দেয়।

আরও